ছাতকে ২০ লাখ টাকার এডিপি-রাজস্ব...
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার ৪নং কালারুকা ইউনিয়ন পরিষদের ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ও রাজস্ব...
যৌতুকের দাবিতে নির্যাতনের অভিযোগে পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা
সংগৃহীত
বিয়ের মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় নববধূ রুকসানা বেগমের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত মামলায় স্বামী আলী হোসেনকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় আসামি পলাতক থাকায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করেছেন আদালত।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে সুনামগঞ্জের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক মোঃ হাবিবুর রহমান চৌধুরী দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।
দণ্ডপ্রাপ্ত আলী হোসেন ছাতক উপজেলার উত্তর খুরমা ইউনিয়নের বড়বিহাই গ্রামের সফর আলীর ছেলে।
মামলার এজাহার ও আদালতে উপস্থাপিত অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল ছাতক উপজেলার চরমহল্লা ইউনিয়নের নানকার গ্রামের মৃত আমিরুল ইসলামের ছোট মেয়ে রুকসানা বেগমের সঙ্গে ৩ লাখ টাকা দেনমোহরে পারিবারিকভাবে আলী হোসেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই বিভিন্ন অজুহাতে রুকসানার প্রবাসী ভাইদের কাছ থেকে যৌতুক আনার জন্য তাকে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হতো।
অভিযোগে আরও বলা হয়, চাহিদামতো ও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জিনিসপত্র দিতে না পারলে আলী হোসেন রুকসানাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। তাকে ‘কালো’, ‘ভাইট্রা (খাটো)’ বলে অপমান, অবহেলা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পাশাপাশি আত্মহত্যার জন্য প্ররোচিত করা হতো। মামলার ভাষ্য অনুযায়ী, যৌতুক না পেলে আলী হোসেন প্রায়ই রুকসানাকে বলতেন, “ফাঁসি দিয়ে মরতে পারস না, তোর বাপের বাড়ি গিয়ে ফাঁসি দিয়ে মর।”
সংসার টিকিয়ে রাখতে রুকসানা তার মা ও ভাইদের কাছ থেকে স্বামীর দাবিকৃত বিভিন্ন জিনিসপত্র এনে দিলেও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। বরং দাম্পত্য জীবনে অবহেলা, মানসিক চাপ ও আত্মহত্যায় প্ররোচনামূলক আচরণ ক্রমেই বাড়তে থাকে। গ্যাস সিলিন্ডার ও ফ্রিজের জন্যও রুকসানার ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
আত্মহত্যার আগে ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মোবাইল ফোনে রুকসানা বিষয়টি তার বোনদের জানান। বোনেরা তাকে আশ্বস্ত করে বলেন, ভাইদের সঙ্গে কথা বলে গ্যাস সিলিন্ডার ও ফ্রিজের ব্যবস্থা করে দ্রুত পাঠিয়ে দেওয়া হবে।
এরপর স্বামীর ধারাবাহিক নির্যাতন ও মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই সকালে স্বামীর বাড়িতে বিদ্যুতের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করেন রুকসানা বেগম। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ওই সময় আলী হোসেন বাড়িতে থাকলেও রুকসানাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেননি।
খবর পেয়ে ছাতক থানা পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে রুকসানার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়।
পরদিন নিহতের বড় বোন নাজমা বেগম বাদী হয়ে ছাতক থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আলী হোসেনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। মামলার পর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। পরে উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি আত্মগোপনে চলে যান।
মামলাটি তদন্ত করেন ছাতক থানার তৎকালীন ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র) রঞ্জন কুমার ঘোষ। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি আলী হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
বিচার চলাকালে রাষ্ট্রপক্ষ ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য উপস্থাপন করে। সাক্ষ্য, আলামত ও অন্যান্য প্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে আদালত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করেন। এর ভিত্তিতে আলী হোসেনকে ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ১০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে পলাতক আসামিকে গ্রেফতারের জন্য পরোয়ানা জারি করা হয়।
নিহতের বড় বোন ও মামলার বাদী নাজমা বেগম বলেন, “বোনকে হারানোর কষ্ট কোনো দিন শেষ হবে না। তবে আদালতের রায়ে আমরা ন্যায়বিচার পেয়েছি বলে মনে করছি। এখন আমাদের একমাত্র দাবি, পলাতক আসামিকে দ্রুত গ্রেফতার করে আদালতের রায় কার্যকর করা হোক।”
বাদীপক্ষের আইনজীবী সিনিয়র এডভোকেট চান মিয়া বলেন, রাষ্ট্রপক্ষের উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও মামলার নথিপত্রে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগ স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আদালত আইনের আলোকে যথাযথ রায় দিয়েছেন।
ছাতকে ব্যাপক আলোচিত এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হলেও, পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে গ্রেফতার করে সাজা কার্যকর হওয়ার পরই মামলার বিচারিক বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে।
টিএ/ছাতক