আর্থিক অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ; ব্যক্তিগত মামলায় বিদ্যালয়ের সাড়ে ৪ লাখ টাকা ব্যয়ের অভিযোগও তদন্তের আওতায়

ছাতকে পাইগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের তদন্ত কমিটি গঠন

post-title

সংগৃহীত

সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার পাইগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু হেনার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম, দায়িত্বে অবহেলা, প্রশ্নপত্র ফাঁস, নিয়োগ বাণিজ্যসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নিজের ব্যক্তিগত মামলায় বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করার অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বে অবহেলা ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় একই বছরের ২৭ জুলাই তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ওই বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন মামলা দায়ের করেন। পরে আদালত বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেন।

তবে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে, ওই মামলায় আবু হেনা বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করেছেন। আদালতের স্থগিতাদেশের পর বিদ্যালয় পরিচালনায় দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা এবং এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে বোর্ড নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগও উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।

এ ছাড়া চলমান বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে নিজের কক্ষে এসি স্থাপন করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান না করে এসি কক্ষে বসে থাকার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিদ্যালয়ের অন্যান্য খাত থেকেও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।

এসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে চলতি বছরের ১ জুলাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন হুমায়ুন রশিদ নামের এক ব্যক্তি। ওই অভিযোগে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেটের প্রবিধানমালা-২০২৪-এর ৬০ নম্বর অনুচ্ছেদের ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী কেন তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, সে বিষয়ে পত্রপ্রাপ্তির ১০ কার্যদিবসের মধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য গত ১৬ আগস্ট তাঁকে নোটিশ দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিন।

এরপর গত ৩০ আগস্ট ওই শিক্ষক নোটিশের জবাব দাখিল করেন। তবে জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গত ২২ সেপ্টেম্বর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শাহ মোঃ শফিউর রহমানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন গোবিন্দগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আতাউর রহমান ও পাইগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের অভিভাবক সদস্য মোহাম্মদ কালাম উল্লাহ। আগামী এক মাসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এর আগে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালে আবু হেনার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, আবু হেনা শিক্ষকতা শুরু করেন উপজেলার কারারুকা ইউনিয়নের হাজী কমর আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানে দশম শ্রেণির নির্বাচনী পরীক্ষার ইংরেজি ও গণিতের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তিনি ক্ষমা চান বলে জানা গেছে।

পরে তিনি উত্তর খুরমা ইউনিয়নের আজমত আলী উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সেখানেও বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে এলাকাবাসীর সঙ্গে তাঁর বিরোধ সৃষ্টি হয়।

পরবর্তী সময়ে তাঁকে মল্লিকপুর এসিএসডিপি উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হলে ওই প্রতিষ্ঠানে তাঁর বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। এরপর উপজেলার সিংচাপইড় ইউনিয়নের একতা উচ্চ বিদ্যালয়ে বদলি করা হলে সেখানে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।

সবশেষে তিনি স্থানীয় পাইগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ে যোগদান করেন। সেখানেও অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ তাঁর বরখাস্তের আদেশ উচ্চ আদালতে স্থগিত হওয়ার পর ওই মামলায় বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করার অভিযোগসহ বিভিন্ন অভিযোগ সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক আবু হেনা জানান, নতুন কোনো অভিযোগের বিষয়ে তাঁর জানা নেই। ২০২৫ সালের বরখাস্তের আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করার পর মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে এবং তাঁকে পুনরায় বহালের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সুয়েব আহমদ বলেন, নতুন করে পাওয়া অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের অর্থ ব্যক্তিগত মামলায় ব্যয় করার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ছাতক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিন বলেন, হুমায়ুন রশিদ কর্তৃক দায়ের করা অভিযোগের বিষয়ে ওই শিক্ষক জবাব দিয়েছেন। তবে জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

টিএ/ছাতক