কিশোর গ্যাংয়ের কাছে জিম্মি সিলেট মহানগরবাসী, ঘটছে হত্যার ঘটনাও

post-title

ছবি AI

নগরজুড়ে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। নগরীর পাড়া-মহল্লা থেকে শুরু করে শহরের প্রধান সড়ক ও অলিগলিতে এখন কিশোর গ্যাংয়ের তীব্র আতঙ্ক তৈরি হয়েছে মাদকের ভয়ংকর নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। 

​তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, নগরীর উপশহর এ-ব্লক দীঘিরপাড় ওয়াকওয়ে, কাজীরবাজার, চৌকিদেখি, বাঁশবাড়ী, বাদামবাগিচা, আখালিয়া, বড়বাজার, খাসদবীর, ইলিয়াকান্দি ও লাক্কাতুড়া এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের সক্রিয় কার্যক্রম রয়েছে।

​তবে এদের বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত এ সকল কিশোরদের কেউই ওই নির্দিষ্ট এলাকাগুলোর স্থায়ী বাসিন্দা নয়। ভাসমান কিংবা সাময়িকভাবে বসবাসকারী এই চক্রগুলোই মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে।

​গত ২৭ জুলাই (সোমবার) রাতে ফুটবল খেলা নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের জের ধরে কতিপয় দুর্বৃত্তের হামলায় রিফাত নামে এক স্কুলছাত্র নিহত হয় এবং গুরুতর আহত হন আরও ২ জন।

​সব মিলিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের কাছে যেন জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ নগরবাসী। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একের পর এক অভিযান চালিয়ে গ্যাং সদস্যদের গ্রেপ্তার করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মিলছে না স্বস্তি। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর সাধারণ পথচারী, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে নারীদের পর্যন্ত নানাভাবে হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে।

​নগরবাসীর অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঝে মাঝেই ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু আইনি ফাঁকফোকর জামিনে বের হয়ে বা নতুন সদস্য নিয়ে তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিটি অভিযানের পর কিছুদিন সাময়িক নীরবতা থাকলেও কিছুদিন পর আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে আসে এই অপরাধ চক্র।

​এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী এক নগরবাসী বলেন, "সন্ধ্যার পর সন্তান বা পরিবার নিয়ে শান্তিতে বের হওয়ার কোনো পরিবেশ নেই। প্রায়ই গলিগুলোতে কিশোরদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও মারামারির ঘটনা ঘটছে। পুলিশে খবর দিলে পুলিশ এসে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যায়, কিন্তু দুই দিন পর অবস্থা আবার আগের মতোই হয়ে যায়। আমরা এর স্থায়ী সমাধান চাই।"

​সচেতন মহল মনে করছেন, সামাজিক সচেতনতা, পারিবারিক নজরদারি বৃদ্ধি, কিশোরদের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত রাখা এবং একই সাথে এসব গ্যাংয়ের পেছনে থাকা নেপথ্য মদদদাতাদের আইনের আওতায় আনা না গেলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না।

​সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিউক) চেয়ারম্যান এবং সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী জানিয়েছেন, নগরীকে কিশোর গ্যাংমুক্ত ও নিরাপদ করাই ছিল তাদের প্রধান নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি।

সাধারণ মানুষের শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা বন্ধে আমরা সিলেট মহানগর বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

তরঙ্গ সমাজ কল্যান সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ডা মো: আব্দুল হাফিজ শাফী বলেন, সিলেট একসময় ছিল শান্তি, শিক্ষা ও সম্প্রীতির শহর। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, ছিনতাই, মারামারি, চাঁদাবাজি এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলো নগরবাসীকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো— এসব ঘটনায় জড়িয়ে পড়ছে আমাদেরই প্রতিবেশী সন্তানরা, যারা ভবিষ্যতে দেশের সম্পদ হওয়ার কথা।

শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান দিয়ে এ সমস্যা পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সমাজ, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংগঠন— সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের বন্ধু, চলাফেরা, অনলাইন কার্যক্রম ও অবসর সময়ের প্রতি আরও দায়িত্বশীল নজর দিতে হবে। বিদ্যালয় ও কলেজগুলোতেও নৈতিক শিক্ষা, কাউন্সেলিং এবং খেলাধুলা-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো জরুরি।


আজ যদি আমরা নীরব থাকি, তাহলে আগামীকাল হয়তো অপরাধের শিকার হবে আমাদেরই কোনো প্রিয়জন। এখনই সময়— সচেতন হওয়ার, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং আমাদের সন্তানদের একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার।



​সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, নগরীতে কিশোর গ্যাং দমনে পুলিশের বিশেষ অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সক্রিয়ভাবে কাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

​পুলিশের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কিশোর গ্যাং ও বিভিন্ন অপরাধের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে মে মাসে ৯৬ জন, জুন মাসে ৭৪৫ জন এবং সর্বশেষ জুলাই মাসে ৫৭৮ জনকে আটক করা হয়েছে।

​পাশাপাশি কিশোর গ্যাংয়ের আড্ডা প্রতিরোধে মহানগরীর সব গেমিং হাউজ ও গেমিং জোনগুলো রাত ৯টার পর খোলা না রাখার জন্য পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।

​অন্যদিকে, গত ২৭ জুলাইয়ের ঘটনার বিষয়ে তিনি জানান, আব্দুস সামি নামে এক মেধাবী শিক্ষার্থী নিহত হওয়া এবং দুই ব্যক্তি গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। লিখিত অভিযোগ বা এজাহার পাওয়া মাত্রই পুলিশ তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

জুয়ে/সিলেট